অর্থঋণ মামলায় একতরফা ডিক্রি রদ: শুধু ১০% জমা নয়, সময়সীমা মানাও জরুরি—হাইকোর্টের গুরুত্বপূর্ণ রায়

অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩: একতরফা ডিক্রি রদ

মামলা: Md. Monir Chowdhury v. Uttara Bank Limited
সিভিল রিভিশন নং: ৪১৬১/২০১৬
বেঞ্চ: বিচারপতি মো. রিয়াজ উদ্দিন খান ও বিচারপতি উর্মী রহমান
রায়ের তারিখ: ৩০ আগস্ট ২০২৬

অর্থঋণ মামলায় একতরফা ডিক্রি রদের জন্য নির্ধারিত সময়ে আবেদন এবং ডিক্রিকৃত অর্থের ১০% জমা—উভয় শর্ত পূরণ করতে হবে। পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে ১০% অর্থ জমা দেওয়া পূর্ববর্তী বিধিবদ্ধ শর্ত পালনে ব্যর্থতা দূর করে না। Md. Monir Chowdhury v. Uttara Bank Limited মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ এ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।

রায়ে আদালত অর্থঋণ আদালত আইন, ২০০৩-এর ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারার পারস্পরিক সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেছেন। একই সঙ্গে বিশেষ আইনের নির্দিষ্ট বিধান অনুসরণ না করে সাধারণ দেওয়ানি কার্যবিধির অন্তর্নিহিত ক্ষমতার যুক্তিতে প্রতিকার পাওয়ার দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন।

মামলার পটভূমি

উত্তরা ব্যাংক লিমিটেড ১৮,৬৩,০০০.১৯ টাকা আদায়ের জন্য ঢাকার চতুর্থ অর্থঋণ আদালতে অর্থঋণ মামলা নং ৪৯/২০১৫ দায়ের করে। ব্যাংকের বক্তব্য অনুযায়ী, বিবাদী নং ২ তাঁর মালিকানাধীন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য জমি বন্ধক রেখে ১২ লাখ টাকার ঋণসুবিধা গ্রহণ করেন। ঋণ পরিশোধ না হওয়ায় বন্ধকি সম্পত্তি বিক্রির চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর মামলাটি দায়ের করা হয়।

বিবাদী লিখিত জবাব দাখিল করে ব্যাংকের দাবির বিরোধিতা করেন। পরবর্তী সময়ে ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০১৬ তারিখে মামলাটি একতরফাভাবে ডিক্রি হয়; ডিক্রি প্রস্তুত হয় ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৬।

বিবাদী ৩০ মে ২০১৬ তারিখে ১৯(২) ধারায় একতরফা ডিক্রি রদের জন্য বিবিধ মামলা নং ৭/২০১৬ দায়ের করেন। তিনি ডিক্রিকৃত অর্থের ১০% জমা দেওয়ার অঙ্গীকার করলেও নির্ধারিত অর্থ জমা দেননি। তাঁর আবেদনগুলো প্রত্যাখ্যাত হয়। এরপর জেলা জজ আদালতে দায়ের করা বিবিধ আপিল নং ১৮৭/২০১৬-ও ২১ আগস্ট ২০১৬ তারিখে খারিজ হয়। ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে রিভিশন দায়ের করেন।

পরবর্তী সময়ে জমা দেওয়ার ভিত্তিতে প্রতিকার দাবি

রুল জারির সময় হাইকোর্ট বিভাগের দ্বৈত বেঞ্চ অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। পরে ১৮ মার্চ ২০২৫ তারিখে একক বেঞ্চ থেকে জারি মামলার সংশ্লিষ্ট আদেশের কার্যকারিতা স্থগিত করা হয় এবং আবেদনকারীকে ১৮ এপ্রিল ২০২৫ তারিখের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০% জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়। আবেদনকারী পরবর্তী সময়ে পরিপালনসংক্রান্ত হলফনামা দাখিল করেন।

চূড়ান্ত শুনানিতে আবেদনকারীর যুক্তি ছিল, আদালতের নির্দেশ অনুযায়ী ১০% অর্থ জমা দেওয়া হয়েছে; তাই একতরফা ডিক্রি রদ করে তাঁকে মূল মামলা প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ দেওয়া উচিত। তিনি আরও দাবি করেন, ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারার সময়সীমা বাধ্যতামূলক নয়; উপযুক্ত ক্ষেত্রে আদালত অন্তর্নিহিত ক্ষমতা প্রয়োগ করে আবেদন গ্রহণ করতে পারেন।

ব্যাংক এর বিরোধিতা করে বলে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আবেদন এবং অর্থ জমার বিধিবদ্ধ শর্ত পূরণ না হওয়ায় একতরফা ডিক্রি রদের সুযোগ নেই।

১৯ ধারায় প্রতিকার পাওয়ার শর্ত

হাইকোর্ট বিভাগ ১৯ ধারার বিধান বিশ্লেষণ করে বলেন—

  1. একতরফা ডিক্রির তারিখ অথবা বিবাদীর সেই ডিক্রি সম্পর্কে জানার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে ডিক্রি রদের আবেদন করতে হবে।
  2. আবেদন দাখিলের তারিখের পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০% জমা দিতে হবে।
  3. বিধিবদ্ধ শর্ত পূরণ হলে ১৯(৪) ধারা অনুযায়ী আবেদন মঞ্জুর হবে, একতরফা ডিক্রি রদ হবে এবং মূল মামলা আগের নম্বর ও নথিতে পুনর্বহাল হবে।

আদালতের ব্যাখ্যায়, আবেদন ও অর্থ জমার শর্ত দুটি একে অপরের বিকল্প নয়। নির্ধারিত সময়ে অর্থ জমা দেওয়ার অঙ্গীকারও প্রকৃত জমার বিকল্প হতে পারে না। অর্থঋণ আদালত আইন একটি বিশেষ আইন হওয়ায় এর নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও সময়সীমা অনুসরণ করতে হবে।

রায়ে আলোচিত তিনটি নজির

Pubali Bank Ltd v. Bangladesh and others, 66 DLR 317

হাইকোর্ট বিভাগ এ মামলার সিদ্ধান্ত উদ্ধৃত করে বলেন, ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারা পরস্পরের পরিপূরক এবং একসঙ্গে পাঠ করতে হবে। আবেদনকারীকে ১৯(২) ধারার সময়সীমা পূরণের বিষয়ে আদালতকে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি ১৯(৩) ধারার অর্থ জমার শর্তও পালন করতে হবে।

উদ্ধৃত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেকোনো একটি শর্ত অপূর্ণ থাকলে অর্থঋণ আদালতের আবেদনটি বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অর্থাৎ, শুধু অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি সামনে এনে আবেদনসংক্রান্ত সময়সীমা বা জমার নির্ধারিত সময় উপেক্ষা করা যায় না।

Osman Gazi Chowdhury v. Artha Rin Adalat, 21 BLC 322

এই মামলার যে পর্যবেক্ষণ বর্তমান রায়ে উদ্ধৃত হয়েছে, তা মূলত বিধিবদ্ধ শর্তগুলোর পালনযোগ্যতা ব্যাখ্যা করে। সেখানে বলা হয়েছে, জমার পরিমাণ ডিক্রিকৃত অর্থের মাত্র ১০%; ডিক্রির বিষয়ে জানার পর আবেদন করার জন্য ৩০ দিন এবং আবেদন দাখিলের পর জমার জন্য আরও ১৫ দিন পাওয়া যায়। পরিশোধপদ্ধতিও নমনীয়—নগদ অর্থ, ব্যাংক ড্রাফট, পে-অর্ডার, চেক বা অন্য হস্তান্তরযোগ্য দলিল ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।

এসব বিবেচনায় শর্তগুলোকে সংক্ষুব্ধ পক্ষের পক্ষে পালনযোগ্য বলে গণ্য করা অযৌক্তিক নয়। বর্তমান রায়ে এই পর্যবেক্ষণ ১৯ ধারার নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণের প্রয়োজনীয়তাকে সমর্থন করেছে।

Prime Global Limited and others v. Sonali Bank Limited and others, Civil Appeal No. 86 of 2015

আপিল বিভাগের এই সিদ্ধান্ত থেকে হাইকোর্ট বিভাগ উদ্ধৃত করেন যে, একতরফা ডিক্রির তারিখ অথবা বিবাদীর তা জানার তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে পুনর্বহালের আবেদন এবং আবেদন দাখিলের ১৫ দিনের মধ্যে ডিক্রিকৃত অর্থের ১০% জমা দেওয়া বিধিবদ্ধ এখতিয়ারগত নির্দেশনা।

এই সিদ্ধান্তের গুরুত্ব হলো, শর্তগুলোকে কেবল আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। এগুলো অনুসরণ ছাড়া পুনর্বহালের প্রতিকার দেওয়া হলে অর্থঋণ আদালত এখতিয়ার প্রয়োগের বিধিবদ্ধ সীমা অতিক্রম করেন।

তিনটি নজির আলোচনা করে বর্তমান মামলায় হাইকোর্ট বিভাগ সিদ্ধান্ত দেন, ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারা অনুসরণ ছাড়া একতরফা ডিক্রি রদের আবেদন মঞ্জুর করার এখতিয়ার অর্থঋণ আদালতের নেই।

অন্তর্নিহিত ক্ষমতার যুক্তি কেন গ্রহণ করা হয়নি

আবেদনকারী Begum Sultana Mazid and others v. Syedul Islam, 10 MLR (AD) 186; Afsaruddin Ahmed v. Banque Indosuez, 1992 BLD (AD) 156; এবং Fazlul Huq v. Md. Tohed Ali and others, 47 DLR 326 মামলার ওপর নির্ভর করেন।

হাইকোর্ট বিভাগ এসব সিদ্ধান্ত পৃথকযোগ্য বলে উল্লেখ করেন। কারণ, সেগুলো দেওয়ানি কার্যবিধির অধীন প্রদত্ত; অর্থঋণ আদালত আইনের মতো বিশেষ আইনের নির্দিষ্ট বিধানের অধীন নয়। আদালত বলেন, বিশেষ আইনে একতরফা ডিক্রি রদের সুনির্দিষ্ট বিধান থাকায় ১৯(২) ও ১৯(৩) ধারার নির্ধারিত সময় অতিক্রম করে ১০% অর্থ জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়ার সুযোগ নেই।

ফলে পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে অর্থ জমা দেওয়া আবেদনকারীর পক্ষে ডিক্রি রদের অধিকার সৃষ্টি করেনি।

সংশ্লিষ্ট বিবিধ আপিল ও অন্তর্বর্তী আদেশ

হাইকোর্ট বিভাগ ২০ ধারার আলোকে সংশ্লিষ্ট প্রত্যাখ্যানের আদেশগুলোর বিরুদ্ধে জেলা জজ আদালতে দায়ের করা বিবিধ আপিলটিকে আইন সম্পর্কে ভুল ধারণার ভিত্তিতে গৃহীত পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করেন।

এ ছাড়া দ্বৈত বেঞ্চ রুল জারির সময় অন্তর্বর্তী প্রতিকার প্রত্যাখ্যান করার পর একক বেঞ্চ থেকে ১০% অর্থ জমার নির্দেশসংবলিত অন্তর্বর্তী আদেশ গ্রহণের বিষয়টিকেও আদালত হাইকোর্ট বিভাগের বিধিমালা, ১৯৭৩-এর পরিপন্থী বলে উল্লেখ করেন।

চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও রায়ের তাৎপর্য

হাইকোর্ট বিভাগ রুল ডিসচার্জ করেন এবং পূর্বে প্রদত্ত স্থগিতাদেশ প্রত্যাহার করেন। খরচ সম্পর্কে কোনো আদেশ দেওয়া হয়নি। ২০১৬ সালে দায়ের করা জারি মামলাটি আর বিলম্ব না করে এগিয়ে নেওয়ার স্বাধীনতা বিচারিক আদালতের রয়েছে বলে আদালত উল্লেখ করেন।

রায়টির নির্ধারক বক্তব্য হলো: ১৯ ধারায় একতরফা অর্থঋণ ডিক্রি রদের প্রতিকার পেতে আবেদনসংক্রান্ত সময়সীমা ও নির্ধারিত সময়ে ১০% অর্থ জমার শর্ত—উভয়টি পূরণ করতে হবে। বর্তমান মামলায় পরবর্তী সময়ে আদালতের নির্দেশে দেওয়া জমা আগের বিধিবদ্ধ শর্ত পালনে ব্যর্থতা দূর করেনি।

সূত্র: Md. Monir Chowdhury v. Uttara Bank Limited, Civil Revision No. 4161 of 2016, রায়: ৩০ আগস্ট ২০২৬। আলোচিত নজিরগুলোর বিবরণ এই রায়ে উদ্ধৃত অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ।

পূর্ণাঙ্গ রায়

পূর্ণাঙ্গ রায় (PDF) পড়ুন / ডাউনলোড করুন