
মামলা: Shahanaz Begum v. Motiur Rahman (deceased) and others | Civil Revision No. 5617 of 2024
বাংলাদেশে ভূমিসংক্রান্ত দেওয়ানি বিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত যৌথ সম্পত্তি আইনগতভাবে বণ্টন না হলে কোনো সহ-শরিক বা তাঁর কাছ থেকে জমি ক্রয়কারী ব্যক্তি নির্দিষ্ট সীমানার জমির ওপর একক স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের ডিক্রি পেতে পারেন কি না?
সম্প্রতি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগ এ প্রশ্নে একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। বিচারপতি মো. সোহরাওয়ার্দী ৬ আগস্ট ২০২৬ তারিখে Shahanaz Begum v. Motiur Rahman (deceased) and others, Civil Revision No. 5617 of 2024 মামলায় রায় প্রদান করেন। রায়টি ১৫ অক্টোবর ২০২৬ সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয়।
মামলার প্রেক্ষাপট
ময়মনসিংহ সদর এলাকার সিএস খতিয়ান নং ৩৬৮-এর অন্তর্ভুক্ত ২৭৩৬ দাগের ৭৮ শতাংশ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত। মূল রেকর্ডীয় মালিক বাজিত শেখের মৃত্যুর পর তাঁর উত্তরাধিকারীদের মধ্যে সম্পত্তির স্বত্ব ও বিভিন্ন দলিলের মাধ্যমে হস্তান্তর নিয়ে বিরোধ সৃষ্টি হয়।
বাদী মতিউর রহমান দাবি করেন, তিনি ১৯৯৪ সালের ২৭ মার্চ নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে আবদুল গণির কাছ থেকে ১৫ শতাংশ জমি ক্রয় করে দখল লাভ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০৯ সালে তাঁকে ওই জমি থেকে উচ্ছেদ করা হয়। এর প্রতিকার চেয়ে তিনি স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলা দায়ের করেন।
অন্যদিকে বিবাদী শাহানাজ বেগম দাবি করেন, তিনি পৃথক নিবন্ধিত দলিলের মাধ্যমে মোট ১০ শতাংশ জমি ক্রয় করে সেখানে ঘরবাড়ি নির্মাণ এবং বিদ্যুৎ-সংযোগ গ্রহণসহ দীর্ঘদিন ভোগদখল করে আসছেন।
বিচারিক আদালত ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪ তারিখে বাদীর পক্ষে ডিক্রি দেন। পরবর্তীতে ২৯ অক্টোবর ২০২৪ তারিখে আপিল আদালত ওই ডিক্রি বহাল রাখেন। এর বিরুদ্ধে বিবাদী হাইকোর্ট বিভাগে দেওয়ানি কার্যবিধির ১১৫(১) ধারায় রিভিশন দায়ের করেন।
হাইকোর্টের সিদ্ধান্ত ও পর্যবেক্ষণ
হাইকোর্ট লক্ষ্য করেন, মূল মালিকের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বিরোধপূর্ণ ৭৮ শতাংশ জমির আইনগত বণ্টন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। একই সঙ্গে উভয় পক্ষের বিক্রেতাদের স্বত্বের ধারাবাহিকতা এবং তাঁরা প্রকৃতপক্ষে কতটুকু জমির মালিক ছিলেন, সে বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রমাণ ছিল না।
এ অবস্থায় আদালত সিদ্ধান্ত দেন, সংশ্লিষ্ট উত্তরাধিকারীদের মধ্যে বণ্টন ব্যতীত বিরোধপূর্ণ জমির নির্দিষ্ট অংশে বাদী বা বিবাদীর চূড়ান্ত স্বত্ব নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
এই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে হাইকোর্ট নিম্ন আদালতদ্বয়ের রায় ও ডিক্রি বাতিল করেন।
Specific Relief Act, 1877-এর ৪২ ধারার প্রয়োগ
এই রায়ের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আইনগত ভিত্তি হলো Specific Relief Act, 1877-এর ৪২ ধারা এবং এর proviso।
উক্ত বিধান অনুসারে, কোনো ব্যক্তি কেবল ঘোষণামূলক প্রতিকার চাইতে পারেন না, যদি তাঁর পক্ষে আরও কার্যকর আনুষঙ্গিক প্রতিকার চাওয়া সম্ভব হয় অথচ তিনি তা দাবি না করেন।
অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তির ক্ষেত্রে বাদী যদি নির্দিষ্ট অংশের স্বত্ব প্রতিষ্ঠা করতে চান, তবে মামলার পরিস্থিতি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট সহ-শরিকদের পক্ষভুক্ত করে বণ্টন অথবা যৌথ দখলের মতো উপযুক্ত প্রতিকার প্রার্থনা করা প্রয়োজন হতে পারে।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, জমির অবিভক্ত অবস্থা স্বত্বের অস্তিত্বকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিলুপ্ত করে না; বরং নির্দিষ্ট সীমানায় একক স্বত্বের বিচারিক ঘোষণা লাভের ক্ষেত্রে আইনগত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
আপিল বিভাগের নজিরের প্রয়োগ
হাইকোর্টের রায়ে আপিল বিভাগের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত অনুসরণ করা হয়েছে।
প্রথমত, Enjaheruddin Mia alias Md. Enjaheruddin Mia v. Mohammad Hossain and others, (1998) 18 BLD (AD) 77 = 50 DLR (AD) 84 মামলায় ঘোষণামূলক প্রতিকারের সঙ্গে প্রয়োজনীয় আনুষঙ্গিক প্রতিকার দাবি করার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, Jahangir Alam (Md.) and others v. Sabdir Ahmed and others, 22 BLC (AD) 75 মামলায় অবিভক্ত সম্পত্তিতে সকল প্রয়োজনীয় সহ-শরিককে পক্ষভুক্ত না করে নির্দিষ্ট সীমানার জমিতে শুধু স্বত্ব ঘোষণা চাওয়ার সীমাবদ্ধতা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তৃতীয়ত, Mrs. Sabiha Khanom v. Jaitun Bibi, 3 MLR (AD) 15 = 3 BLC (AD) 175 মামলায় আপিল বিভাগ স্পষ্ট করেছেন যে, কোনো সহ-শরিকের কাছ থেকে জমি ক্রয় করলেই ক্রেতার অধিকার বিলুপ্ত হয় না। তবে নির্দিষ্ট অংশের স্বত্ব চূড়ান্তভাবে নির্ধারণের জন্য যথাযথ বণ্টন মামলা প্রয়োজন হতে পারে।
এই নজিরগুলো থেকে প্রতীয়মান হয়, যৌথ সম্পত্তিতে অংশীদারিত্বের অধিকার এবং নির্দিষ্ট সীমানার পৃথক মালিকানা এক বিষয় নয়।
খতিয়ান, দলিল ও প্রকৃত মালিকানার পার্থক্য
হাইকোর্টের রায়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, এসএ বা আরএস খতিয়ানে কারও নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেই তিনি জমির চূড়ান্ত মালিক হয়ে যান না।
আদালত পর্যবেক্ষণ করেন, জামির্দি শেখের তিন কন্যা সুরমান, জারিমন ও করিমনকে বাদ দিয়ে এসএ খতিয়ান প্রস্তুত হয়েছিল। কিন্তু ভুল রেকর্ডের কারণে তাঁদের উত্তরাধিকারসূত্রে অর্জিত স্বত্ব বিলুপ্ত হয়নি।
এ প্রসঙ্গে আদালত Guru Charan Mondal and others v. Sree Bhaba Sindhu Sarkar and others, 13 MLR (AD) 6 এবং Government of Bangladesh v. Har Chandra Nath and others, 10 MLR (AD) 313 মামলার সিদ্ধান্ত বিবেচনা করেন।
সুতরাং, ভূমির মালিকানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে দলিলের ধারাবাহিকতা, উত্তরাধিকার, প্রকৃত স্বত্ব এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক সাক্ষ্য-প্রমাণ বিবেচনা করা অপরিহার্য। খতিয়ান গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হলেও সেটি নিজে স্বত্ব সৃষ্টির দলিল নয়।
দখল ও উচ্ছেদ প্রমাণের দায়
মামলার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল বাদীর উচ্ছেদের অভিযোগ।
হাইকোর্ট দেখতে পান, শাহানাজ বেগম ১৯৯৭ সালে জমি ক্রয়ের পর ঘর নির্মাণ, ২০০২ সালে বিদ্যুৎ-সংযোগ গ্রহণ এবং নিয়মিত বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের প্রমাণ উপস্থাপন করেছেন।
অপরদিকে বাদী মতিউর রহমান ২০০৯ সালের ২৭ এপ্রিল জমি থেকে উচ্ছেদ হওয়ার অভিযোগ যথাযথভাবে প্রমাণ করতে পারেননি।
আদালত সিদ্ধান্ত দেন, স্বত্ব ঘোষণা ও খাস দখল পুনরুদ্ধারের মামলায় বাদীকে সংশ্লিষ্ট জমিতে পূর্ববর্তী দখল এবং পরবর্তী উচ্ছেদের বিষয় প্রমাণ করতে হবে। এই মামলায় সেই প্রমাণের ঘাটতি ছিল।
রায়ের ব্যবহারিক গুরুত্ব
এই সিদ্ধান্ত ভূমিসংক্রান্ত দেওয়ানি মামলা পরিচালনা, দলিল যাচাই এবং জমি ক্রয়ের ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রদান করে।
1. অবিভক্ত সম্পত্তি ক্রয়: কোনো সহ-শরিকের কাছ থেকে জমি ক্রয়ের আগে তাঁর প্রকৃত অংশ এবং জমির বণ্টনসংক্রান্ত অবস্থা যাচাই করা প্রয়োজন।
2. মামলার প্রতিকার নির্বাচন: যৌথ সম্পত্তিতে নির্দিষ্ট সীমানার স্বত্ব দাবি করার ক্ষেত্রে শুধু ঘোষণামূলক প্রতিকার যথেষ্ট কি না, নাকি বণ্টন ও অন্যান্য প্রতিকার প্রয়োজন, তা নির্ধারণ করতে হবে।
3. উত্তরাধিকারীদের অন্তর্ভুক্তি: বণ্টনসংক্রান্ত বিরোধে সকল প্রয়োজনীয় সহ-শরিককে পক্ষভুক্ত করার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
4. দলিলের ধারাবাহিকতা: বিক্রেতার দলিল থাকাই যথেষ্ট নয়; তাঁর পূর্বসূরির স্বত্ব এবং হস্তান্তরের আইনগত ভিত্তিও যাচাই করতে হবে।
5. দখলের প্রমাণ: ঘর নির্মাণ, বিদ্যুৎ-সংযোগ, বিল, কর পরিশোধ ও অন্যান্য নথি বাস্তব দখল প্রমাণের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক সাক্ষ্য হতে পারে। তবে এগুলো এককভাবে মালিকানার চূড়ান্ত প্রমাণ নয়।
উপসংহার
Shahanaz Begum v. Motiur Rahman মামলার রায় অবিভক্ত যৌথ সম্পত্তিতে স্বত্ব ঘোষণা, জমি বণ্টন, দলিলের ধারাবাহিকতা এবং দখল পুনরুদ্ধারের বিষয়ে প্রচলিত আইনগত নীতিগুলো পুনর্ব্যক্ত করেছে।
হাইকোর্ট শুধু নিম্ন আদালতের ডিক্রি বাতিল করেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; বরং স্পষ্ট করেছেন যে, সংশ্লিষ্ট জমির ক্রেতা কিংবা মূল মালিকের উত্তরাধিকারীরা যথাযথ বণ্টন মামলা দায়ের করতে পারবেন।
রায়টির বিশেষ তাৎপর্য হলো, অবিভক্ত সম্পত্তিতে ক্রেতার অধিকার থাকতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার নির্দিষ্ট সীমানার পৃথক মালিকানায় রূপান্তরিত হয়েছে কি না, তা উপযুক্ত বিচারিক প্রক্রিয়া ও প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে।
একই সঙ্গে রায়টি স্মরণ করিয়ে দেয়, নিম্ন আদালত গুরুত্বপূর্ণ দলিল ও সাক্ষ্য উপেক্ষা করলে এবং তার ফলে ন্যায়বিচারের ব্যত্যয় ঘটলে রিভিশনাল এখতিয়ারে হাইকোর্ট হস্তক্ষেপ করতে পারেন।

